
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও প্রায় দেড় হাজার প্রার্থী এখনো নিয়োগপত্র পাননি। দীর্ঘ আট মাসের অপেক্ষার পর ভেরিফিকেশনের নামে বিপুল সংখ্যক প্রার্থী বাদ পড়ায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগবঞ্চিতরা বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ, মানববন্ধন এবং জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। তাদের দাবি, বাদ পড়ার কারণ প্রকাশ, নথি পুনঃযাচাই এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। তবু চূড়ান্ত নিয়োগপত্রে নাম না থাকায় তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে—বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর নথি নিরপেক্ষভাবে পুনঃযাচাই, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থা, ভুল-ত্রুটি সংশোধন এবং ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। সরকারি চাকরিতে প্রবেশ রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয় নয়। একজন নাগরিক হিসেবে চাকরিপ্রার্থীর মেধা ও যোগ্যতাই হওয়া উচিত একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। তিনি বলেন, ভেরিফিকেশনের নামে ফ্যাসিবাদী আমলের এই অপকর্ম পরিত্যাগ করুন।
এ পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলো কঠোর অবস্থান নিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের উপস্থিতিতে শনিবার সচিবালয়ে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব জেসমিন নাহার, অতিরিক্ত সচিব মনোয়ারা ইশরাত, মোখলেসুর রহমান এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌস। সভা শেষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ অক্টোবরের মধ্যে উত্তীর্ণ কেউ নিয়োগপত্র না পেলে পরবর্তী সময়ে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানান, যারা এখন পর্যন্ত নিয়োগপত্র পাননি, তাদের ১ অক্টোবরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র পাঠানো হবে। এদিকে মন্ত্রণালয়ের দাবি, সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীদের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, তার একাডেমিক রেকর্ড ভালো—বৃন্দাবন সরকারি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ও সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে মাস্টার্সেও ফার্স্ট ক্লাস।
ভুক্তভোগী প্রার্থীদের অভিযোগের শেষ নেই। চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ থানার তামান্না, যিনি মেধাতালিকায় প্রথম এবং পুরো জেলায় ১১তম স্থান অধিকার করেছিলেন, তিনি এনএসআই ও পুলিশ ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন। তার অভিযোগ, কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে ‘পলিটিক্যাল ট্যাগ’ দিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার মেধাবী জাহিদ হাসান, যার মেধাক্রম ৮৩ জনের মধ্যে ৫৪তম, তিনিও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এছাড়া ভোলায় ২৫৬ জনের মধ্যে ৮৪ জন এবং সুনামগঞ্জে ৬৩৫ জনের মধ্যে ১২০ জন সুপারিশপ্রাপ্ত নিয়োগপত্র না পাওয়ার দাবি করেছেন। নিয়োগবঞ্চিতদের প্ল্যাটফর্ম ‘চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক-২০২৫’ শুক্রবার পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, আড়াই হাজারেরও বেশি প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি, যদিও এ বিষয়ে সরকারি কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনো দেওয়া হয়নি। ভোলায় ২৫৬ জন সুপারিশপ্রাপ্তের মধ্যে ৮৪ জন নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন—এমন দাবি করে তারা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় আরেক বিবৃতিতে আন্দোলনরত প্রার্থীদের একটি প্ল্যাটফর্ম দাবি করেছে, নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীর সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ নিয়ে তোলপাড় চলছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ফেসবুক পোস্টে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে রাজনীতিকরণ না করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, মেধাকে সম্মান দিতে হবে। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও বাদ পড়া প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের নামে প্রায় ১,০০০ তরুণকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
ছাত্র সংগঠনগুলোও এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। ইসলামী ছাত্রশিবির ভেরিফিকেশনের নীতিমালা প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। এছাড়া জাতীয় ছাত্রশক্তি গত বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে।
উল্লেখ্য, গত ৮ ফেব্রুয়ারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ এর চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়, যেখানে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে সুপারিশ করা হয়েছিল। তার আগে ৬৯ হাজার ২৬৫ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। গত বুধবার মন্ত্রণালয় নির্বাচিতদের নিয়োগপত্র ও পদায়ন আদেশ জারির প্রশাসনিক অনুমোদন দিলেও তাতে ভেরিফিকেশনে নেতিবাচক প্রতিবেদন থাকলে নিয়োগ না দেওয়ার নির্দেশ ছিল। এখন মন্ত্রণালয়ের আশ্বাসের পর নিয়োগবঞ্চিতদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।
প্রতিনিধির নাম 

























