ঢাবিতে নিকাব বিতর্ক ও শিক্ষককে বিরতি: শ্রেণিকক্ষটা তাহলে কার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন শিক্ষককে ক্লাস থেকে সরিয়ে দিতে সময় লেগেছে এক রাতেরও কম। প্রায় ৩৪ বছর ধরে শিক্ষকতা করা সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুবকে গত বৃহস্পতিবার জানানো হয়, তাঁর সব কোর্স অন্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ মঙ্গলবারের সেই ক্লাসে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তাঁর কাছে কোনো ব্যাখ্যা চাওয়া হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ সম্প্রতি এর উত্তর দিয়েছে। এক মঙ্গলবার মাস্টার্সের ক্লাসে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা হয়। এর মধ্যে কেউ তাঁর কাছে জানতে চায়নি, সেদিন আসলে কী হয়েছিল। তা নিয়ে জাতীয় দৈনিকে মতামত কলাম কেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যা করে, অন্যরা তা নজির হিসেবে ধরে নেয়।

দুই ভাষ্য ও বিচারহীন প্রক্রিয়া

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই শিক্ষক নিকাব ও পর্দার ধরন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। অন্যদিকে, শিক্ষক তাঁর ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, চোখ দেখা না যাওয়ায় শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করতে ও যোগাযোগের অসুবিধার কথা তিনি তুলে ধরেছিলেন। কোনটি সত্য, তা যাচাই করার চেষ্টা না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ন্যায়বিচারের প্রাথমিক পাঠ হলো অভিযোগ লিখিতভাবে আসা, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা এবং নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে যাচাই হওয়া। এখানে এর কিছুই মানা হয়নি। বিভাগের জরুরি সভা ডাকা হয়েছিল আগের সন্ধ্যায়, আর শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগ প্রশাসনে পৌঁছায় পরদিন দুপুরে। অর্থাৎ রায় প্রস্তুত ছিল, মামলা দায়ের হয়েছে পরে।

স্বায়ত্তশাসন ও ফেসবুকের রায়

প্রশাসন অভিযোগ গ্রহণ করেছে, কিন্তু বিভাগকে থামিয়ে নিয়মের পথে আনেনি। যে বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের আদেশের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে গর্ব করে, সে-ই যদি ফেসবুকের রায় কার্যকর করার দপ্তর হয়ে যায়, তাহলে স্বায়ত্তশাসনের মানে কী থাকে? এই প্রক্রিয়াহীনতায় কেবল শিক্ষক নন, সেই শিক্ষার্থী নিজেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, আবার খারিজও হয়নি; বরং তা মিছিলের স্লোগান ও রাজনীতির পুঁজিতে পরিণত হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া কেবল অভিযুক্তের রক্ষাকবচ নয়, এটি অভিযোগকারীর মর্যাদাও। শিক্ষা-ইকোসিস্টেমের প্রধান অংশ শ্রেণিকক্ষে এখন আস্থার অভাব তৈরি হচ্ছে। যদি প্রতিটি বাক্য রেকর্ড হওয়ার ভয় থাকে, তবে সেখানে আর মুক্ত চিন্তা সম্ভব নয়। শ্রেণিকক্ষ কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের নয়, এটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের। এখানে নিকাব পরা মুখ আর খোলা মুখ পাশাপাশি থাকতে পারে, কিন্তু ভয় থাকতে পারে না। এটি আমাদেরই ফিরিয়ে আনতে হবে।

  • শিক্ষক তাসনীম সিরাজ মাহবুব প্রায় ৩৪ বছর ধরে অধ্যাপনা করছেন।
  • ক্লাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে কথোপকথনটি কয়েক মিনিটের ছিল।
  • শিক্ষকের কোনো অভিযোগ প্রমাণিত বা খারিজ হয়নি।
  • পোশাক শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে প্রশাসনের নীরবতা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কে ঝুঁকিতে ফেলছে।
  • ফেসবুকের বেনামি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে উগ্র রাজনীতির ছক বাস্তবায়িত হচ্ছে।
  • শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল ইস্যুর মতো এই ঘটনাটিও শ্রেণিকক্ষের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলছে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের আদেশ অনুযায়ী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।
  • পোশাক নিয়ে একটি স্পষ্ট নীতিমালা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
  • সহযোগিতামূলক পরিবেশের অভাবে শিক্ষা ও সংলাপ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জনপ্রিয় সংবাদ

​বগুড়ার নন্দীগ্রামে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় গৃহবধূসহ নিহত ২

Verified by MonsterInsights

ঢাবিতে নিকাব বিতর্ক ও শিক্ষককে বিরতি: শ্রেণিকক্ষটা তাহলে কার

আপলোডের সময় : 11:19:21 am, Thursday, 15 October 2026

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন শিক্ষককে ক্লাস থেকে সরিয়ে দিতে সময় লেগেছে এক রাতেরও কম। প্রায় ৩৪ বছর ধরে শিক্ষকতা করা সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুবকে গত বৃহস্পতিবার জানানো হয়, তাঁর সব কোর্স অন্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ মঙ্গলবারের সেই ক্লাসে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তাঁর কাছে কোনো ব্যাখ্যা চাওয়া হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ সম্প্রতি এর উত্তর দিয়েছে। এক মঙ্গলবার মাস্টার্সের ক্লাসে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা হয়। এর মধ্যে কেউ তাঁর কাছে জানতে চায়নি, সেদিন আসলে কী হয়েছিল। তা নিয়ে জাতীয় দৈনিকে মতামত কলাম কেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যা করে, অন্যরা তা নজির হিসেবে ধরে নেয়।

দুই ভাষ্য ও বিচারহীন প্রক্রিয়া

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই শিক্ষক নিকাব ও পর্দার ধরন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। অন্যদিকে, শিক্ষক তাঁর ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, চোখ দেখা না যাওয়ায় শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করতে ও যোগাযোগের অসুবিধার কথা তিনি তুলে ধরেছিলেন। কোনটি সত্য, তা যাচাই করার চেষ্টা না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ন্যায়বিচারের প্রাথমিক পাঠ হলো অভিযোগ লিখিতভাবে আসা, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা এবং নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে যাচাই হওয়া। এখানে এর কিছুই মানা হয়নি। বিভাগের জরুরি সভা ডাকা হয়েছিল আগের সন্ধ্যায়, আর শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগ প্রশাসনে পৌঁছায় পরদিন দুপুরে। অর্থাৎ রায় প্রস্তুত ছিল, মামলা দায়ের হয়েছে পরে।

স্বায়ত্তশাসন ও ফেসবুকের রায়

প্রশাসন অভিযোগ গ্রহণ করেছে, কিন্তু বিভাগকে থামিয়ে নিয়মের পথে আনেনি। যে বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের আদেশের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে গর্ব করে, সে-ই যদি ফেসবুকের রায় কার্যকর করার দপ্তর হয়ে যায়, তাহলে স্বায়ত্তশাসনের মানে কী থাকে? এই প্রক্রিয়াহীনতায় কেবল শিক্ষক নন, সেই শিক্ষার্থী নিজেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, আবার খারিজও হয়নি; বরং তা মিছিলের স্লোগান ও রাজনীতির পুঁজিতে পরিণত হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া কেবল অভিযুক্তের রক্ষাকবচ নয়, এটি অভিযোগকারীর মর্যাদাও। শিক্ষা-ইকোসিস্টেমের প্রধান অংশ শ্রেণিকক্ষে এখন আস্থার অভাব তৈরি হচ্ছে। যদি প্রতিটি বাক্য রেকর্ড হওয়ার ভয় থাকে, তবে সেখানে আর মুক্ত চিন্তা সম্ভব নয়। শ্রেণিকক্ষ কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের নয়, এটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের। এখানে নিকাব পরা মুখ আর খোলা মুখ পাশাপাশি থাকতে পারে, কিন্তু ভয় থাকতে পারে না। এটি আমাদেরই ফিরিয়ে আনতে হবে।

  • শিক্ষক তাসনীম সিরাজ মাহবুব প্রায় ৩৪ বছর ধরে অধ্যাপনা করছেন।
  • ক্লাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে কথোপকথনটি কয়েক মিনিটের ছিল।
  • শিক্ষকের কোনো অভিযোগ প্রমাণিত বা খারিজ হয়নি।
  • পোশাক শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে প্রশাসনের নীরবতা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কে ঝুঁকিতে ফেলছে।
  • ফেসবুকের বেনামি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে উগ্র রাজনীতির ছক বাস্তবায়িত হচ্ছে।
  • শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল ইস্যুর মতো এই ঘটনাটিও শ্রেণিকক্ষের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলছে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের আদেশ অনুযায়ী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।
  • পোশাক নিয়ে একটি স্পষ্ট নীতিমালা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
  • সহযোগিতামূলক পরিবেশের অভাবে শিক্ষা ও সংলাপ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।