প্রাথমিকে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের ক্ষোভ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন অসংখ্য প্রার্থী। ভেরিফিকেশন বা প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই শেষে প্রকাশিত তালিকায় তাদের নাম না থাকায় নিয়োগ জটিলতা তৈরি হয়েছে। চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্মের তথ্যমতে, বাদ পড়া প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। অন্য একটি হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা ২ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে, যদিও সরকারিভাবে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নিয়োগের তালিকা থেকে প্রার্থীদের নাম বাদ পড়ার পেছনে প্রধানত চারটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদনই মুখ্য। এছাড়া ডোপ টেস্টে অযোগ্যতা, স্বাস্থ্য সনদ না থাকা এবং শিক্ষাগত সনদে গরমিল থাকার কারণেও অনেকের নাম বাদ পড়েছে। মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিয়মিত অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

এই পরিস্থিতিতে বাদ পড়া প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্মটি পাঁচটি দাবি জানিয়েছে। তারা প্রতিটি বাদ পড়া প্রার্থীর নথি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনর্যাচাই এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ চেয়েছেন। এছাড়া তথ্যের ভুল বা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে কেউ ভুক্তভোগী হয়ে থাকলে তা সংশোধন করে অবিলম্বে নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন পরিস্থিতির কারণ জনসমক্ষে পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন ভুক্তভোগী প্রার্থীরা। তথ্যগত ভুল বা অসংগতির শিকার প্রার্থীদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ ও প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থাও চেয়েছেন তারা। একই সঙ্গে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত অথচ নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন পরিস্থিতির কারণ জনসমক্ষে ব্যাখ্যার দাবি জানিয়েছেন তারা।

২৪ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে এই জটিলতা প্রকাশ্যে আসে। বিভিন্ন জেলার তথ্য যোগ করলে অন্তত ৩৫১ জন প্রার্থীর নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে ১২০ জন, বগুড়ায় ৪৮ জন, নাটোরে ৩৪ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪ জন, মানিকগঞ্জে ২২ জন, রাজবাড়ীতে ১৫ জন, চাঁদপুরে ২৭ জন এবং কুষ্টিয়ায় ১৬ জনসহ অন্যান্য জেলাতেও অসংখ্য প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। পরিস্থিতি বিবেচনায় খুলনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও যশোরের অনেক প্রার্থী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে ২৭, মুন্সীগঞ্জে ৩, শরীয়তপুরে ৬, সাতক্ষীরায় ২, ঝালকাঠিতে ১২, লক্ষ্মীপুরে ২, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭, পাবনায় ৩৫, রাজবাড়ীতে ১৫, ফরিদপুরে ১২, বগুড়ায় ৪৮, সুনামগঞ্জে ১২০, কুষ্টিয়ায় ১৬ এবং মানিকগঞ্জে ২২ জন। সুনামগঞ্জে বাদ পড়েছেন ১২০ জন, মৌলভীবাজারে ৬৭ জন এবং নাটোরে প্রতিবন্ধীসহ ৩৪ জন চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও নিয়োগপত্র পাননি। সুনামগঞ্জে ৬১৭ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য সুপারিশ পাঠানো হলেও সর্বশেষ যাচাইয়ে ১২০ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য ভিন্ন। তারা বলছে, নিয়োগপত্র নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত যদি কোনো উত্তীর্ণ প্রার্থী নিয়োগপত্র না পান, তবে পরবর্তী সময়ে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ে তাদের নিয়োগপত্র পর্যায়ক্রমে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, ১ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদানের সময়সীমা এবং ৪ অক্টোবর পদায়নের পরিকল্পনা বহাল রয়েছে।

উল্লেখ্য, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ এর লিখিত পরীক্ষা গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় অনুষ্ঠিত হয়। উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জন মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন এবং ৮ ফেব্রুয়ারি অধিদপ্তর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে। ওই ফলাফলে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছিল। তবে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর কেন অনেকের নাম নিয়োগ তালিকা থেকে বাদ পড়ল এবং তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী ধরনের নেতিবাচক তথ্য রয়েছে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। খুলনায় ২৭৫ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হলেও ২৬৫ জন কাগজপত্র জমা দেন। এর মধ্যে ১৯৬ জন নিয়োগপত্র পেয়েছেন এবং ৬৯ জন পাননি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

প্রাথমিকে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের ক্ষোভ

আপলোডের সময় : 09:39:50 am, Monday, 28 September 2026

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন অসংখ্য প্রার্থী। ভেরিফিকেশন বা প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই শেষে প্রকাশিত তালিকায় তাদের নাম না থাকায় নিয়োগ জটিলতা তৈরি হয়েছে। চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্মের তথ্যমতে, বাদ পড়া প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। অন্য একটি হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা ২ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে, যদিও সরকারিভাবে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নিয়োগের তালিকা থেকে প্রার্থীদের নাম বাদ পড়ার পেছনে প্রধানত চারটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদনই মুখ্য। এছাড়া ডোপ টেস্টে অযোগ্যতা, স্বাস্থ্য সনদ না থাকা এবং শিক্ষাগত সনদে গরমিল থাকার কারণেও অনেকের নাম বাদ পড়েছে। মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিয়মিত অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

এই পরিস্থিতিতে বাদ পড়া প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্মটি পাঁচটি দাবি জানিয়েছে। তারা প্রতিটি বাদ পড়া প্রার্থীর নথি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনর্যাচাই এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ চেয়েছেন। এছাড়া তথ্যের ভুল বা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে কেউ ভুক্তভোগী হয়ে থাকলে তা সংশোধন করে অবিলম্বে নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন পরিস্থিতির কারণ জনসমক্ষে পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন ভুক্তভোগী প্রার্থীরা। তথ্যগত ভুল বা অসংগতির শিকার প্রার্থীদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ ও প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থাও চেয়েছেন তারা। একই সঙ্গে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত অথচ নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন পরিস্থিতির কারণ জনসমক্ষে ব্যাখ্যার দাবি জানিয়েছেন তারা।

২৪ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে এই জটিলতা প্রকাশ্যে আসে। বিভিন্ন জেলার তথ্য যোগ করলে অন্তত ৩৫১ জন প্রার্থীর নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে ১২০ জন, বগুড়ায় ৪৮ জন, নাটোরে ৩৪ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪ জন, মানিকগঞ্জে ২২ জন, রাজবাড়ীতে ১৫ জন, চাঁদপুরে ২৭ জন এবং কুষ্টিয়ায় ১৬ জনসহ অন্যান্য জেলাতেও অসংখ্য প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। পরিস্থিতি বিবেচনায় খুলনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও যশোরের অনেক প্রার্থী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে ২৭, মুন্সীগঞ্জে ৩, শরীয়তপুরে ৬, সাতক্ষীরায় ২, ঝালকাঠিতে ১২, লক্ষ্মীপুরে ২, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭, পাবনায় ৩৫, রাজবাড়ীতে ১৫, ফরিদপুরে ১২, বগুড়ায় ৪৮, সুনামগঞ্জে ১২০, কুষ্টিয়ায় ১৬ এবং মানিকগঞ্জে ২২ জন। সুনামগঞ্জে বাদ পড়েছেন ১২০ জন, মৌলভীবাজারে ৬৭ জন এবং নাটোরে প্রতিবন্ধীসহ ৩৪ জন চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও নিয়োগপত্র পাননি। সুনামগঞ্জে ৬১৭ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য সুপারিশ পাঠানো হলেও সর্বশেষ যাচাইয়ে ১২০ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য ভিন্ন। তারা বলছে, নিয়োগপত্র নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত যদি কোনো উত্তীর্ণ প্রার্থী নিয়োগপত্র না পান, তবে পরবর্তী সময়ে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ে তাদের নিয়োগপত্র পর্যায়ক্রমে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, ১ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদানের সময়সীমা এবং ৪ অক্টোবর পদায়নের পরিকল্পনা বহাল রয়েছে।

উল্লেখ্য, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ এর লিখিত পরীক্ষা গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় অনুষ্ঠিত হয়। উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জন মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন এবং ৮ ফেব্রুয়ারি অধিদপ্তর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে। ওই ফলাফলে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছিল। তবে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর কেন অনেকের নাম নিয়োগ তালিকা থেকে বাদ পড়ল এবং তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী ধরনের নেতিবাচক তথ্য রয়েছে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। খুলনায় ২৭৫ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হলেও ২৬৫ জন কাগজপত্র জমা দেন। এর মধ্যে ১৯৬ জন নিয়োগপত্র পেয়েছেন এবং ৬৯ জন পাননি।