
রাজধানী ঢাকায় চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। ফুটপাথ থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার, গৃহনির্মাণ, হাসপাতাল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবখানেই এখন চাঁদাবাজদের অবাধ বিচরণ। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ছত্রছায়ায় এসব অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। পুলিশি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ঢাকা মহানগরীর ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতে মোট ৭২৩টি চাঁদাবাজির মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে মোহাম্মদপুর থানায়, এরপর রয়েছে যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর ইতিমধ্যে ৪২৫টি মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও অনেক মামলার বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে বলে জানা গেছে। শুধু অভিযোগই নয় অনেক ভুক্তভোগী থানায় মামলাও করছেন। এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগে করা মামলার ৮৫ শতাংশের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি ঢাকার ৫০টি থানার চাঁদাবাজি ও দখলসংক্রান্ত মামলার তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমনই চিত্র। নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ২০ মাসে মহানগরে চাঁদাবাজির ৩৬৫টি মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে। আর ১৫ শতাংশ মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে চিহ্নিত চাঁদাবাজের সংখ্যা ১ হাজার ২৮০ জন। এর মধ্যে ১৪৮ জন অস্ত্রধারী চাঁদাবাজ সরাসরি অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করছে। থানা-পুলিশ, ডিবি, এসবি এবং ডিএমপি কমিশনারের গোয়েন্দা ইউনিটের সম্মিলিত অনুসন্ধানে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। অস্ত্রধারী চাঁদাবাজদের তালিকায় উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছে শামীম, জাকির হোসেন, আবুল বাশার বাদশা, কায়সার (গলাকাটা কায়সার), মহারাজ মিয়া, শফিকুল ইসলাম হেলাল, তানভীর, আরিফ হোসেন রিপন, আবু সাঈদ রাসেল, কাওসার মোল্লা (কানা কাওসার), সায়মন, বরিশাইল্যা শান্ত, নাহিদ, মামুন, রাব্বী, মিনহাজ, আরিফ (পিস্তল আরিফ) এবং শুভ (ঘাতক শুভ)। এ ছাড়াও সুব্রত বাইন গ্রুপের তালিকাভুক্ত অস্ত্রধারীদের মধ্যে বিপু, আরাফাত ইব্নে নাসির, শরীফ ও মধুর নাম উঠে এসেছে। এদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের এক পরিসংখ্যানে ঢাকায় প্রায় ১২৮০ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজদের নাম উঠে এসেছে।
এলাকাভিত্তিক অপরাধী চক্রের সক্রিয়তার বিষয়টিও তালিকায় স্পষ্ট হয়েছে। চকবাজার এলাকায় সালাউদ্দিন (বিয়ার সালাউদ্দিন) ও হাসান সারোয়ার পিলু, সবুজবাগ এলাকায় রিফাতুল্লাহ নাঈম, হৃদয় সরকার, সাঈদ, শফিকুল ইসলাম ও নুরুন্নবী বাবু এবং খিলগাঁও এলাকায় মকবুল হোসেন, মিন্টু (কিলার মিন্টু), আলিফ ও শুভ (রিপন) চাঁদাবাজিতে সক্রিয়। তাদের মধ্যে আলিফের মতো অনেকে আবার কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৌশলী চাঁদাবাজরা এখন ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোরদের ব্যবহার করছে, কারণ আইনের ফাঁকফোকরে তারা সহজেই পার পেয়ে যায়।
ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই প্রাণনাশের শঙ্কায় থানায় মামলা করতে চান না। যারা সাহস করে মামলা করছেন, পুলিশ তদন্তে তাদের প্রায় ৮৫ শতাংশ অভিযোগের সত্যতা পাচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে বলেন, শুধুমাত্র তালিকা তৈরি বা কাউকে কাউকে গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। যখন কোনো কার্যকর উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত তৈরি হয় না, তখন অপরাধীরা নতুন নতুন মুখ নিয়ে চাঁদাবাজির ধারা বজায় রাখে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে তালিকা থাকার পরও তাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে এই অপতৎপরতা বন্ধ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ছে। তদন্তাধীন রয়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ মামলা।
প্রতিনিধির নাম 

























