দত্তকের আড়ালে রাজধানীতে রমরমা শিশু কেনাবেচার সিন্ডিকেট

রাজধানী ঢাকায় দত্তক নেয়ার নামে গড়ে উঠেছে একটি অভিনব ও ভয়াবহ অপরাধী চক্র। বিভিন্ন হাসপাতালের দেয়ালে প্রচারণা চালানো থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক ফেসবুক পেজে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে চলছে শিশু কেনাবেচার রমরমা বাণিজ্য। এসব চক্রের রয়েছে আলিশান অফিস, যেখানে তারা শিশু দত্তক দেয়ার আড়ালে সরাসরি কমিশনের বিনিময়ে শিশুদের পণ্যের মতো বিক্রি করছে। চক্রটির সাথে হাসপাতালের কর্মচারী ও নার্সসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পোস্টের নিচে অনেকে কমেন্টস করছেন-বয়স কতো লাগবে।

বর্তমান সময়ে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও শারীরিক সমস্যার কারণে অনেকেই বন্ধ্যত্বজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এই দম্পতিরাই মূলত প্রতারক চক্রের মূল লক্ষ্য। দালাল বা ব্রোকার হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে চক্রটি শিশুদের পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখায়। চাহিদা অনুযায়ী ছেলে বা মেয়ে শিশু সরবরাহ করতে তারা সক্ষম। নিয়ম অনুযায়ী, ছেলে শিশুর দাম নির্ধারণ করা হয় সর্বনিম্ন ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা এবং মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে তা ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত। সরকারি স্ট্যাম্পে এফিডেভিট ও নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে আইনি বৈধতার ভান করে শিশু হস্তান্তর করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ব্রোকার ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন পেয়ে থাকেন। এমনকি মায়ের গর্ভে থাকাকালীনই ডেলিভারি খরচ ও দেখভালের দায়িত্ব নেয়ার শর্তে শিশু বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ভেজাল খাদ্যসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমান সমাজে অনেকেই বাচ্চা হওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছেন। পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রমসহ বিভিন্ন কারণেও দীর্ঘদিন চেষ্টার পরও অনেকে বন্ধ্যত্বতায় ভুগছেন। গর্ভবতী মায়ের দেখভালের খরচ, ডেলিভারি খরচ চুকিয়ে টাকার বিনিময়ে বাচ্চা চলে যাচ্ছে অন্যের হাতে। কেউ আবার বলছেন- ‘সাত মাসের বাচ্চা আছে, ইনবক্সে আসেন’।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের কারবার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ‘আর্জেন্ট ছেলে বাচ্চা লাগবে’ বা ‘নবজাতক দত্তক দেয়া হবে’—এ ধরনের শত শত পোস্ট পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘বাচ্চা দত্তক নেয়া এবং দেয়ার গ্রুপ’ নামক একটি পেজে যোগাযোগ করা হলে ‘হ্যান্ডসাম ক্রোকোডাইল-৮৯৯’ নামে একটি আইডি থেকে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর চেয়ে সরাসরি দরকষাকষিতে নামা হয়। এছাড়া ‘তিন্নি চৌধুরী’ নামের অন্য একজন আইডি ব্যবহারকারী সাড়ে ৩ লাখ টাকা বিনিময়ে প্রায় ৩-৪ বছর বয়সী একটি ছেলে শিশু বিক্রির প্রস্তাব দেন। তিনি দাবি করেন, ডিভোর্সের কারণে তার বোন বাচ্চাটি লালন-পালন করতে পারছে না, তাই তিনি এটি দত্তক দিতে চাচ্ছেন। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাচ্চা বেচাকেনা বা বাচ্চা দত্তক দিচ্ছি-নিচ্ছি লিখে সার্চ করলে শত শত পেজ সামনে আসে।

চক্রের সদস্যরা নিজেদের কখনো চিকিৎসক বা হাসপাতালের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। চট্টগ্রাম মেডিকেলের পরিচয় দেয়া এমন এক ব্যক্তি দাবি করেন, হাসপাতালে জন্ম নেয়া শিশুর লালন-পালনের সামর্থ্য না থাকায় পরিবারগুলো বাচ্চা দিতে আগ্রহী। তিনি দাবি করেন, স্ট্যাম্পের মাধ্যমে সারা জীবনের জন্য বাচ্চা হস্তান্তর করা হবে এবং কেউ আর খোঁজ নিতে আসবে না। আইন অনুযায়ী একজনের সন্তান অন্যকে অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তর করা যে অবৈধ, এমন প্রশ্ন করলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাছাড়া এই চক্রটি পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন স্থানে বাচ্চার জোগান দেয় এবং গর্ভ ভাড়া বা সারোগেসির মাধ্যমেও শিশু কেনাবেচার কাজ করে থাকে। তাদের দেয়া তথ্যমতে, ছেলে শিশুর তুলনায় মেয়ে শিশুর চাহিদা বেশি থাকায় দামের তারতম্য ঘটে। ছেলে বাচ্চা নিতে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে বলে তারা জানায়।

আইন বিশেষজ্ঞরা কঠোরভাবে সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, শিশু কেনাবেচা বা অর্থের বিনিময়ে শিশুকে চিরতরে হস্তান্তর করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী শিশুর প্রতি যে কোনো ধরনের শোষন, নিষ্ঠুরতা বা অবহেলার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এছাড়া আদালতের গ্রহণযোগ্যতা নেই এমন কোনো কাগজ বা এফিডেভিট তৈরি করে শিশু হস্তান্তর করা আইনত অবৈধ। ২০২৫ সালের ইউনিসেফের প্রকাশিত ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিক’ প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দত্তকের নামে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে শিশু কেনাবেচার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। তিনি বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং তারা এটি নিয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ করছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

দত্তকের আড়ালে রাজধানীতে রমরমা শিশু কেনাবেচার সিন্ডিকেট

আপলোডের সময় : 09:00:28 am, Saturday, 10 October 2026

রাজধানী ঢাকায় দত্তক নেয়ার নামে গড়ে উঠেছে একটি অভিনব ও ভয়াবহ অপরাধী চক্র। বিভিন্ন হাসপাতালের দেয়ালে প্রচারণা চালানো থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক ফেসবুক পেজে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে চলছে শিশু কেনাবেচার রমরমা বাণিজ্য। এসব চক্রের রয়েছে আলিশান অফিস, যেখানে তারা শিশু দত্তক দেয়ার আড়ালে সরাসরি কমিশনের বিনিময়ে শিশুদের পণ্যের মতো বিক্রি করছে। চক্রটির সাথে হাসপাতালের কর্মচারী ও নার্সসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পোস্টের নিচে অনেকে কমেন্টস করছেন-বয়স কতো লাগবে।

বর্তমান সময়ে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও শারীরিক সমস্যার কারণে অনেকেই বন্ধ্যত্বজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এই দম্পতিরাই মূলত প্রতারক চক্রের মূল লক্ষ্য। দালাল বা ব্রোকার হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে চক্রটি শিশুদের পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখায়। চাহিদা অনুযায়ী ছেলে বা মেয়ে শিশু সরবরাহ করতে তারা সক্ষম। নিয়ম অনুযায়ী, ছেলে শিশুর দাম নির্ধারণ করা হয় সর্বনিম্ন ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা এবং মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে তা ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত। সরকারি স্ট্যাম্পে এফিডেভিট ও নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে আইনি বৈধতার ভান করে শিশু হস্তান্তর করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ব্রোকার ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন পেয়ে থাকেন। এমনকি মায়ের গর্ভে থাকাকালীনই ডেলিভারি খরচ ও দেখভালের দায়িত্ব নেয়ার শর্তে শিশু বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ভেজাল খাদ্যসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমান সমাজে অনেকেই বাচ্চা হওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছেন। পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রমসহ বিভিন্ন কারণেও দীর্ঘদিন চেষ্টার পরও অনেকে বন্ধ্যত্বতায় ভুগছেন। গর্ভবতী মায়ের দেখভালের খরচ, ডেলিভারি খরচ চুকিয়ে টাকার বিনিময়ে বাচ্চা চলে যাচ্ছে অন্যের হাতে। কেউ আবার বলছেন- ‘সাত মাসের বাচ্চা আছে, ইনবক্সে আসেন’।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের কারবার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ‘আর্জেন্ট ছেলে বাচ্চা লাগবে’ বা ‘নবজাতক দত্তক দেয়া হবে’—এ ধরনের শত শত পোস্ট পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘বাচ্চা দত্তক নেয়া এবং দেয়ার গ্রুপ’ নামক একটি পেজে যোগাযোগ করা হলে ‘হ্যান্ডসাম ক্রোকোডাইল-৮৯৯’ নামে একটি আইডি থেকে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর চেয়ে সরাসরি দরকষাকষিতে নামা হয়। এছাড়া ‘তিন্নি চৌধুরী’ নামের অন্য একজন আইডি ব্যবহারকারী সাড়ে ৩ লাখ টাকা বিনিময়ে প্রায় ৩-৪ বছর বয়সী একটি ছেলে শিশু বিক্রির প্রস্তাব দেন। তিনি দাবি করেন, ডিভোর্সের কারণে তার বোন বাচ্চাটি লালন-পালন করতে পারছে না, তাই তিনি এটি দত্তক দিতে চাচ্ছেন। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাচ্চা বেচাকেনা বা বাচ্চা দত্তক দিচ্ছি-নিচ্ছি লিখে সার্চ করলে শত শত পেজ সামনে আসে।

চক্রের সদস্যরা নিজেদের কখনো চিকিৎসক বা হাসপাতালের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। চট্টগ্রাম মেডিকেলের পরিচয় দেয়া এমন এক ব্যক্তি দাবি করেন, হাসপাতালে জন্ম নেয়া শিশুর লালন-পালনের সামর্থ্য না থাকায় পরিবারগুলো বাচ্চা দিতে আগ্রহী। তিনি দাবি করেন, স্ট্যাম্পের মাধ্যমে সারা জীবনের জন্য বাচ্চা হস্তান্তর করা হবে এবং কেউ আর খোঁজ নিতে আসবে না। আইন অনুযায়ী একজনের সন্তান অন্যকে অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তর করা যে অবৈধ, এমন প্রশ্ন করলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাছাড়া এই চক্রটি পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন স্থানে বাচ্চার জোগান দেয় এবং গর্ভ ভাড়া বা সারোগেসির মাধ্যমেও শিশু কেনাবেচার কাজ করে থাকে। তাদের দেয়া তথ্যমতে, ছেলে শিশুর তুলনায় মেয়ে শিশুর চাহিদা বেশি থাকায় দামের তারতম্য ঘটে। ছেলে বাচ্চা নিতে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে বলে তারা জানায়।

আইন বিশেষজ্ঞরা কঠোরভাবে সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, শিশু কেনাবেচা বা অর্থের বিনিময়ে শিশুকে চিরতরে হস্তান্তর করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী শিশুর প্রতি যে কোনো ধরনের শোষন, নিষ্ঠুরতা বা অবহেলার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এছাড়া আদালতের গ্রহণযোগ্যতা নেই এমন কোনো কাগজ বা এফিডেভিট তৈরি করে শিশু হস্তান্তর করা আইনত অবৈধ। ২০২৫ সালের ইউনিসেফের প্রকাশিত ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিক’ প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দত্তকের নামে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে শিশু কেনাবেচার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। তিনি বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং তারা এটি নিয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ করছেন।