পুরান ঢাকায় চম্পা বিবির রহস্যময় সমাধি

পুরান ঢাকার সরু গলি আর দোকানের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো চম্পা বিবির সমাধিসৌধ। প্রায় ৩৫৫ বছর বয়সী এই স্মৃতিস্তম্ভটি ঢাকার মোগল আমলের এক অনন্য নিদর্শন। এই এলাকাটি বর্তমানে চম্পাতলী হিসেবে পরিচিত, যা তাঁর নামেই নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু শত বছর পেরিয়ে গেলেও এই চম্পা বিবি আসলে কে ছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একটি দোকানের আড়ালে লুকিয়ে আছে সাড়ে তিন শ বছরের পুরোনো এক সমাধিসৌধ। অথচ তাঁর নামেই পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটের পাশ থেকে চকবাজারের কাছাকাছি বিস্তীর্ণ একটি এলাকার নাম হয়েছে চম্পাতলী। বুড়িগঙ্গার তীরের অদূরে ঢাকার অতি বিখ্যাত ও ততোধিক দুর্দশাগ্রস্ত মোগল স্থাপনা ছোট কাটরার প্রথম ফটকের কাছেই চম্পা বিবির সমাধি। ছোট কাটরার সঙ্গে তুলনা করলে চম্পা বিবির সমাধিসৌধের হাল এখনো বেশ ভালো বলেই কবুল করতে হয়।

সমাধিসৌধটির প্রবেশদ্বারের পাথরের ফলকে স্পষ্টভাবে খোদাই করা আছে, ‘ছোট কাটরা স্থিত চম্পা বিবির মাজার, শায়েস্তা খান কর্তৃক ১৬৭১ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত।’ এই লিপিটি স্থাপনার নির্মাণের কাল নির্দিষ্ট করে দিলেও চম্পা বিবির পারিবারিক বা সামাজিক পরিচয়ের রহস্যের জট খোলেনি। প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ বইয়ে জানিয়েছেন যে, মোগল সুবাদার শায়েস্তা খান ১৬৬৩ সালে বসবাসের জন্য ছোট কাটরা নামের তিনতলা ইমারতটি তৈরি করেছিলেন। যদিও শায়েস্তা খান নিজে সেখানে থাকতেন কি না তা নিয়ে সংশয় আছে, তবে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র খোদাবন্দ খান ওরফে মির্জা বাঙালি এবং চম্পা বিবি সেখানে বসবাস করতেন বলে জানা যায়। অবশ্য তাঁর সমাধির অবস্থাও খুব সুবিধার নয়।

চম্পা বিবির পরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের গবেষণায় বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। মুনতাসীর মামুনের বর্ণনা অনুযায়ী, চম্পা বিবি নবাবের কন্যা ছিলেন। অন্যদিকে, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার মতে তিনি ছিলেন শায়েস্তা খানের স্ত্রী। আবার হাকিম হাবিবুর রহমানের দেওয়া তথ্যমতে, চম্পা বিবি ছিলেন নবাবের একজন উপপত্নী। রহমান আলী তায়েশের লেখাতেও স্ত্রী বা উপপত্নী হিসেবেই তাঁকে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পর্কের ধরন যা-ই হোক, নবাব শায়েস্তা খান যে তাঁকে গভীরভাবে সম্মান করতেন বা তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তার প্রমাণ মেলে এই সুদৃশ্য সমাধিসৌধটি নির্মাণের মাধ্যমে। চম্পা বিবির পরিচয় নিয়ে যত জটিল রহস্যই থাকুক, তাঁর সমাধি খুঁজে পাওয়া অতটা জটিল নয়।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে সমাধিটি এক গম্বুজবিশিষ্ট এবং বর্গাকার। এর প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য বাইরের দিক থেকে ৭.২৭ মিটার। ইটের তৈরি এই সৌধের চার দেয়ালে একটি করে দরজা রয়েছে, যার উভয় পাশে সরু মিনার সজ্জিত। ছাদের ওপর থাকা গম্বুজটি আট কোণাকৃতির ড্রামের ওপর বসানো। বর্তমানে সৌধটির অবস্থা বেশ করুণ। অযত্ন আর অবহেলায় গম্বুজের গায়ে শেওলা জন্মেছে, আর চারপাশ লতাগুল্মে ঢাকা পড়ে গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো একক দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা সংস্থা নেই। স্থানীয় সাতটি পরিবার সম্মিলিতভাবে এর দেখাশোনা করে। যদিও এর গম্বুজ ছেয়ে গেছে শেওলায়, আর চারপাশ দিয়ে গজিয়ে ওঠা লতাগুল্মের পরাক্রমে স্থাপত্যশৈলী চোখে দেখার উপায় নেই।

ঐতিহাসিকদের মতে, একসময় ছোট কাটরা ওয়াকফ করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এর মালিকানা বিভিন্ন হাতবদল হয়েছে। মুন্সী রহমান আলী তায়েশের ‘তাওয়ারিখে ঢাকা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ব্রিটিশ শাসনামলে শেফার্ড নামের এক পাদরি ছোট কাটরায় বসবাসের সময় এই সমাধিসৌধের ভেতরের মূল কবরটি ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। পরে হয়তো কোনো একসময় তা পুনর্নির্মাণ করা হয়, কিন্তু তার বিস্তারিত ইতিহাস অজানা। বর্তমানে এশিয়াটিক সোসাইটির ‘ঢাকা কোষ’ অনুযায়ী, এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষিত কোনো স্থাপনা নয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ মোগল স্থাপত্যটির আদি রূপ হারিয়ে গেছে এবং বর্তমানে এটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জায়গাগুলোর আড়ালে পড়ে আছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

পুরান ঢাকায় চম্পা বিবির রহস্যময় সমাধি

আপলোডের সময় : 11:51:03 am, Wednesday, 14 October 2026

পুরান ঢাকার সরু গলি আর দোকানের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো চম্পা বিবির সমাধিসৌধ। প্রায় ৩৫৫ বছর বয়সী এই স্মৃতিস্তম্ভটি ঢাকার মোগল আমলের এক অনন্য নিদর্শন। এই এলাকাটি বর্তমানে চম্পাতলী হিসেবে পরিচিত, যা তাঁর নামেই নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু শত বছর পেরিয়ে গেলেও এই চম্পা বিবি আসলে কে ছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একটি দোকানের আড়ালে লুকিয়ে আছে সাড়ে তিন শ বছরের পুরোনো এক সমাধিসৌধ। অথচ তাঁর নামেই পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটের পাশ থেকে চকবাজারের কাছাকাছি বিস্তীর্ণ একটি এলাকার নাম হয়েছে চম্পাতলী। বুড়িগঙ্গার তীরের অদূরে ঢাকার অতি বিখ্যাত ও ততোধিক দুর্দশাগ্রস্ত মোগল স্থাপনা ছোট কাটরার প্রথম ফটকের কাছেই চম্পা বিবির সমাধি। ছোট কাটরার সঙ্গে তুলনা করলে চম্পা বিবির সমাধিসৌধের হাল এখনো বেশ ভালো বলেই কবুল করতে হয়।

সমাধিসৌধটির প্রবেশদ্বারের পাথরের ফলকে স্পষ্টভাবে খোদাই করা আছে, ‘ছোট কাটরা স্থিত চম্পা বিবির মাজার, শায়েস্তা খান কর্তৃক ১৬৭১ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত।’ এই লিপিটি স্থাপনার নির্মাণের কাল নির্দিষ্ট করে দিলেও চম্পা বিবির পারিবারিক বা সামাজিক পরিচয়ের রহস্যের জট খোলেনি। প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ বইয়ে জানিয়েছেন যে, মোগল সুবাদার শায়েস্তা খান ১৬৬৩ সালে বসবাসের জন্য ছোট কাটরা নামের তিনতলা ইমারতটি তৈরি করেছিলেন। যদিও শায়েস্তা খান নিজে সেখানে থাকতেন কি না তা নিয়ে সংশয় আছে, তবে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র খোদাবন্দ খান ওরফে মির্জা বাঙালি এবং চম্পা বিবি সেখানে বসবাস করতেন বলে জানা যায়। অবশ্য তাঁর সমাধির অবস্থাও খুব সুবিধার নয়।

চম্পা বিবির পরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের গবেষণায় বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। মুনতাসীর মামুনের বর্ণনা অনুযায়ী, চম্পা বিবি নবাবের কন্যা ছিলেন। অন্যদিকে, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার মতে তিনি ছিলেন শায়েস্তা খানের স্ত্রী। আবার হাকিম হাবিবুর রহমানের দেওয়া তথ্যমতে, চম্পা বিবি ছিলেন নবাবের একজন উপপত্নী। রহমান আলী তায়েশের লেখাতেও স্ত্রী বা উপপত্নী হিসেবেই তাঁকে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পর্কের ধরন যা-ই হোক, নবাব শায়েস্তা খান যে তাঁকে গভীরভাবে সম্মান করতেন বা তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তার প্রমাণ মেলে এই সুদৃশ্য সমাধিসৌধটি নির্মাণের মাধ্যমে। চম্পা বিবির পরিচয় নিয়ে যত জটিল রহস্যই থাকুক, তাঁর সমাধি খুঁজে পাওয়া অতটা জটিল নয়।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে সমাধিটি এক গম্বুজবিশিষ্ট এবং বর্গাকার। এর প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য বাইরের দিক থেকে ৭.২৭ মিটার। ইটের তৈরি এই সৌধের চার দেয়ালে একটি করে দরজা রয়েছে, যার উভয় পাশে সরু মিনার সজ্জিত। ছাদের ওপর থাকা গম্বুজটি আট কোণাকৃতির ড্রামের ওপর বসানো। বর্তমানে সৌধটির অবস্থা বেশ করুণ। অযত্ন আর অবহেলায় গম্বুজের গায়ে শেওলা জন্মেছে, আর চারপাশ লতাগুল্মে ঢাকা পড়ে গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো একক দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা সংস্থা নেই। স্থানীয় সাতটি পরিবার সম্মিলিতভাবে এর দেখাশোনা করে। যদিও এর গম্বুজ ছেয়ে গেছে শেওলায়, আর চারপাশ দিয়ে গজিয়ে ওঠা লতাগুল্মের পরাক্রমে স্থাপত্যশৈলী চোখে দেখার উপায় নেই।

ঐতিহাসিকদের মতে, একসময় ছোট কাটরা ওয়াকফ করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এর মালিকানা বিভিন্ন হাতবদল হয়েছে। মুন্সী রহমান আলী তায়েশের ‘তাওয়ারিখে ঢাকা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ব্রিটিশ শাসনামলে শেফার্ড নামের এক পাদরি ছোট কাটরায় বসবাসের সময় এই সমাধিসৌধের ভেতরের মূল কবরটি ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। পরে হয়তো কোনো একসময় তা পুনর্নির্মাণ করা হয়, কিন্তু তার বিস্তারিত ইতিহাস অজানা। বর্তমানে এশিয়াটিক সোসাইটির ‘ঢাকা কোষ’ অনুযায়ী, এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষিত কোনো স্থাপনা নয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ মোগল স্থাপত্যটির আদি রূপ হারিয়ে গেছে এবং বর্তমানে এটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জায়গাগুলোর আড়ালে পড়ে আছে।