
নাগরিকের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং হয়রানি ও দালালনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে যথাযথ প্রস্তুতি, অবকাঠামো এবং ধারাবাহিকতার অভাবে কোনো উদ্যোগ যখন অল্প সময়ের মধ্যেই অচল হয়ে পড়ে, তখন তা কেবল অর্থ ও শ্রমের অপচয়ই নয়, বরং সরকারের সক্ষমতা ও পরিকল্পনা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চালু হওয়া ছয়টি নাগরিক সেবাকেন্দ্রের বর্তমান করুণ দশা সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
‘এক ঠিকানায় সকল নাগরিক সেবা’ স্লোগান নিয়ে ২০২৫ সালের ২৬ মে ঢাকার ছয়টি স্থানে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এই কেন্দ্রগুলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এর লক্ষ্য ছিল পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, সাধারণ ডায়েরি ও ভূমিসেবাসহ প্রায় ৪৫০ ধরনের সেবা নাগরিকদের হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া। তৎকালীন সরকারের দাবি ছিল, এর মাধ্যমে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কমবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘব হবে।
কিন্তু উদ্বোধনের মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটির চিত্র হতাশাজনক হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ছয়টি কেন্দ্রের চারটিতেই তালা ঝুলছে। একটি কেন্দ্র মাঝেমধ্যে খোলা হলেও সেখানে সেবাগ্রহীতার উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। গুলশানের কেন্দ্রটি নিয়মিত খোলা থাকলেও সেবাপ্রার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। মোহাম্মদপুরের কেন্দ্রের অবস্থা আরও নাজুক; সেখানে অগোছালো অবস্থায় পড়ে আছে দুটি টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার, নেই কোনো উদ্যোক্তা বা সেবাপ্রার্থী। অথচ এই কেন্দ্রগুলোকে নাগরিক সেবা সহজ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
এই ব্যর্থতার পেছনে মৌলিক প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট। কেন্দ্রগুলো চালুর আগে কম্পিউটার, প্রিন্টার, ইন্টারনেট সংযোগ, বায়োমেট্রিক যন্ত্রপাতি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি পোর্টালের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা হয়নি। এছাড়া উদ্যোক্তাদের জন্য কোনো টেকসই আর্থিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। প্রতিটি সেবার বিপরীতে নির্ধারিত ফি পাওয়ার কথা থাকলেও, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সেবাপ্রার্থীর অভাবে একজন উদ্যোক্তার পক্ষে এই কাজকে পেশা হিসেবে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
উদ্যোগটি চালুর সময় যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব প্রস্তুতির অসামঞ্জস্য ছিল প্রকট। ‘শূন্য বাজেটে’ প্রকল্প বাস্তবায়নের সাফল্য হিসেবে প্রচার করা হলেও, বাস্তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সংযোগ নিশ্চিত করতেই বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল। জনসেবা কেবল স্লোগান বা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে টেকসই হয় না; এর জন্য প্রয়োজন অর্থ, জনবল, প্রযুক্তি, জবাবদিহি এবং নিয়মিত মূল্যায়ন।
বর্তমান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ ঘোষণা করেনি। আইসিটি বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব জানিয়েছেন, কার্যক্রমটি প্রত্যাশিতভাবে টেকসই হয়নি এবং এর সুফলও পাওয়া যায়নি। প্রয়োজনে ভিন্ন কোনো পদ্ধতিতে উদ্যোগটি পুনরায় চালুর পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে নতুন করে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আগের উদ্যোগের ব্যর্থতার কারণগুলো গভীরভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং নাগরিকের ভোগান্তি প্রকৃত অর্থে কমানো। কোন সেবা অনলাইনে দেওয়া সম্ভব, কোনটির জন্য শারীরিক উপস্থিতি প্রয়োজন, উদ্যোক্তার আয় কীভাবে স্থিতিশীল রাখা হবে এবং কেন্দ্রের কার্যক্রম কে নিয়মিত তদারক করবে—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর ছাড়া নতুন উদ্যোগও ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।